বর্তমানে কত টাকা থাকলে যাকাত ফরজ হয়?

যাকাতের নিসাব কী এবং বর্তমানে ঠিক কত টাকা হাতে থাকলে যাকাত দিতে হবে। স্বর্ণ নাকি রুপা—কোন হিসাবে যাকাত দেবেন এবং কিভাবে নিজেই যাকাত হিসাব করবেন, বিস্তারিত জানুন।

আমাদের অনেকের মনেই একটা ধারণা আছে যে, অনেক টাকার মালিক না হলে হয়তো যাকাত দেওয়া লাগে না। কিন্তু একজন আর্থিক বিষয়ে সচেতন মুসলিম হিসেবে আমাদের বোঝা উচিত, যাকাত শুধু একটি ইবাদত নয়, বরং এটি একটি সুষম অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তি। ইসলামে নামাজ যেমন ফরজ, নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে যাকাত দেওয়াও ঠিক তেমনই ফরজ।

আমরা যারা ব্যক্তিগত অর্থায়ন বা পার্সোনাল ফাইন্যান্স নিয়ে ভাবি, তাদের জন্য যাকাতের হিসাবটি জানা জরুরি। কারণ, যাকাত আপনার সম্পদকে পবিত্র করে এবং বরকত বৃদ্ধি করে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“আর তোমরা নামাজ কায়েম করো এবং যাকাত প্রদান করো।” (সূরা বাকারা: ৪৩)।

আজকের এই ব্লগে আমরা একদম সহজ ভাষায় জানব, বর্তমানে ঠিক কত টাকা আপনার হাতে বা ব্যাংকে থাকলে আপনার ওপর যাকাত ফরজ হবে এবং কীভাবে আপনি নিজেই সেই হিসাবটি বের করবেন।

বর্তমানে কত টাকা থাকলে যাকাত ফরজ হয়?

ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী নিসাব পরিমাণ যাকাতযোগ্য নগদ টাকা বা সম্পদ থাকলে যাকাত ফরত হয়। নিসাব হচ্ছে ৭.৫ ভরি স্বর্ন অথবা ৫২.৫ ভরি রূপার বিক্রয়মুল্যের সমপরিমাণ অর্থ বা ব্যবসার পণ্য।

অর্থাৎ, আজকের স্বর্ণের দাম অনুসারে ৭.৫ ভরি স্বর্ণের সর্বনিম্ন বিক্রয়মূল্য ১৬,৭৩,০৫৫ টাকা থাকলে যাকাত ফরজ হয়। অথবা, রূপার হিসাব অনুসারে ৫২.৫ ভরি রূপার সর্বনিম্ন বিক্রয়মূল্য ২,৮৫,০০০ টাকা থাকলে যাকাত ফরজ হবে।

যাকাত ফরজ হওয়ার বিষয়ে শুধু এতটুকুই যথেষ্ট নয়, যাকাত ফরজ হওয়ার শর্ত, নিসাব কি, কোন কোন সম্পদের উপর কিভাবে যাকাত দিতে হয়, কিভাবে যাকাত হিসাব করতে হবে সব জানা জরুরী।

আসুন এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানি।

যাকাত ফরজ হওয়ার শর্ত

হুট করে পকেটে কিছু টাকা আসলেই কিন্তু যাকাত ফরজ হয়ে যায় না। ইসলামী শরিয়ত মতে, যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ হতে হয়। ফিকহুল ইসলামী অনুযায়ী, একজন ব্যক্তির ওপর যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য ৭টি মূল শর্ত রয়েছে:

  1. মুসলিম হওয়া: যাকাত কেবল মুসলিমদের ওপর ফরজ।
  2. স্বাধীন হওয়া: পরাধীন বা দাস-দাসীর ওপর যাকাত ফরজ নয়।
  3. প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া: নাবালকের সম্পদের ওপর যাকাত ফরজ নয় (তবে এ নিয়ে মতভেদ আছে, কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া প্রধান মত)।
  4. সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী হওয়া: মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন ব্যক্তির ওপর যাকাত নেই।
  5. নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া: শরিয়ত নির্ধারিত নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদ থাকতে হবে।
  6. সম্পদের ওপর পূর্ণ মালিকানা: সম্পদটি আপনার নিজের দখলে এবং ব্যবহারে থাকতে হবে। যেমন, কেউ আপনার থেকে টাকা ধার নিয়ে আর ফেরত দিচ্ছে না বা পাওয়ার আশা নেই—এমন টাকার যাকাত দিতে হয় না।
  7. এক বছর অতিবাহিত হওয়া (হাওলানুল হাওল): নিসাব পরিমাণ সম্পদ হাতে আসার পর চন্দ্রবর্ষ হিসেবে এক বছর পূর্ণ হতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে সম্পদের ওপর এক বছর অতিবাহিত হয়নি, তাতে কোনো যাকাত নেই।” (ইবনে মাজাহ)।

নিসাব কী?

ফাইন্যান্সের ভাষায় আমরা যেমন ‘ট্যাক্স-ফ্রি ইনকাম লিমিট’ বা করমুক্ত আয়ের সীমার কথা বলি। ঠিক তেমনি, ‘নিসাব’ হলো যাকাত ফরজ হওয়ার সর্বনিম্ন সীমা।

সহজ কথায়, আপনার মৌলিক প্রয়োজন (যেমন—থাকার ঘর, পরনের কাপড়, খাওয়ার খরচ, পেশাগত যন্ত্রপাতি) মেটানোর পর যদি নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদ আপনার কাছে জমা থাকে, তবেই আপনি ‘সাহেবে নিসাব’ বা নিসাবের মালিক বলে গণ্য হবেন। আর তখনই আপনার ওপর যাকাত ফরজ হবে।

নবী করীম (সা.)-এর যুগে বিনিময়ের মাধ্যম ছিল স্বর্ণ ও রৌপ্য। তাই তিনি এই দুটি ধাতুর ওপর ভিত্তি করে নিসাব নির্ধারণ করে দিয়েছেন।

বর্তমানে নিসাবের পরিমাণ কত টাকা?

এটিই পাঠকদের সবচেয়ে কমন প্রশ্ন। যেহেতু টাকার মান বা কারেন্সি এখন স্বর্ণ বা রৌপ্যের মতো স্থির নয়, তাই আমাদের স্বর্ণ ও রৌপ্যের মানদণ্ডেই টাকার হিসাব করতে হয়। হাদিস শরীফ অনুযায়ী নিসাবের পরিমাপ হলো:

  • স্বর্ণের ক্ষেত্রে: ৭.৫ ভরি স্বর্ণ বা তার বিক্রয়মুল্যের সমপরিমাণ অর্থ। (গ্রামের হিসাবে প্রায় ৮৭.৪৮ গ্রাম স্বর্ণ)।
  • রৌপ্যের ক্ষেত্রে: ৫২.৫ ভরি রৌপ্য তার বিক্রয়মুল্যের সমপরিমাণ অর্থ। (গ্রামের হিসাবে প্রায় ৬১২.৩৬ গ্রাম)।

এখন প্রশ্ন হলো, টাকায় এর পরিমাণ কত? আপনারা জানেন, স্বর্ণ বা রূপার দাম আন্তর্জাতিক বাজার অনুসারে প্রতিনিয়তই পরিবর্তন হতে থাকে। আপনি যেইদিন যাকাতের নিসাব হিসাব করবেন, সেই দিনের বাজারে বিক্রয়মূল্য অনুসারে টাকায় হিসাব করবেন।

স্বর্ণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে সাধারণত, বাজুস কর্তৃক নির্ধারিত দাম থেকে ১৫% বাদ দিয়ে বিক্রয়মুল্য পাওয়া যায়। অর্থাৎ, স্বর্ণের বর্তমান ক্রয়মূল্য ১,০০,০০০ টাকা হলে, আপনি তা বিক্রয় করলে ৮৫,০০০ টাকা পাবেন। এক্ষেত্রে, টাকায় নিসাব পরিমাপ করার সময় বিক্রয়মুল্যে হিসাব করতে হবে।

উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ জুয়েলার্স এসোসিয়েশনের ঘোষনা অনুযায়ী আজ প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ২,৬২,৪৪০ টাকা হলে, সাড়ে ৭ ভরি স্বর্ণের ক্রয়মূল্য ১৯,৬৮,৩০০ টাকা। এই স্বর্ণের বিক্রয়মূল্য ১৫% কম হবে।

সুতরাং, বিক্রয়মূল্য হবে বাজারমূল্য থেকে ১৫% কম, অর্থাৎ, ১৯,৬৮,৩০০ – (১৯,৬৮,৩০০ × ১৫%)
= ১৯,৬৮,৩০০ – ২,৯৫,২৪৫
= ১৬,৭৩,০৫৫ টাকা।

অর্থাৎ, আপনার কাছে যদি ঋণমুক্ত অবস্থায় এবং মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত ১৬,৭৩,০৫৫ টাকা (আনুমানিক) বা তার সমপরিমাণ তরল সম্পদ বা ব্যবসায়িক পণ্য থাকে, তবেই আপনার ওপর যাকাত ফরজ।

(দ্রষ্টব্য: স্বর্ণ ও রুপার বাজার দর প্রতিদিন পরিবর্তন হয়। তাই যাকাত দেওয়ার দিন আপনাকে স্থানীয় জুয়েলারি দোকান বা বাজুস (BAJUS) থেকে সেই দিনের রুপার সঠিক দাম জেনে হিসাব করতে হবে।)

স্বর্ণ না রুপা—কোন নিসাব ধরবেন?

এখানেই অনেকে প্যাঁচ লাগিয়ে ফেলেন, যে স্বর্ণের হিসাব অনুসারে যাকাত দিবেন নাকি রূপার হিসাব অনুসারে দিবেন। আপনার কাছে যদি শুধু স্বর্ণ থাকে (টাকা বা রুপা নেই), তবে স্বর্ণের নিসাব (সাড়ে ৭ ভরি) পূর্ণ না হলে যাকাত দিতে হবে না।

কিন্তু বর্তমান যুগে আমাদের সম্পদ সাধারণত মিশ্র অবস্থায় থাকে। আমাদের কিছু নগদ টাকা থাকে, কিছু স্বর্ণ থাকে, হয়তো কিছু শেয়ার বা বন্ড থাকে। ইসলামী ফিকহবিদদের (বিশেষ করে হানাফি মাজহাব মতে) সুস্পষ্ট অভিমত হলো— গরিবের উপকারের স্বার্থে যেই নিসাবটি ধরলে যাকাতদাতার সংখ্যা বাড়ে এবং দরিদ্ররা বেশি উপকৃত হয়, সেটাই ধরতে হবে।

যেহেতু স্বর্ণের দাম অনেক বেশি (সাড়ে ৭ ভরি স্বর্ণের দাম ১৫-১৬ লাখ টাকার ওপরে হতে পারে), তাই স্বর্ণের নিসাব ধরলে খুব কম মানুষই যাকাতের আওতায় পড়বেন। অন্যদিকে রুপার নিসাব (দেড় থেকে দুই লাখ টাকা) ধরলে অনেকেই যাকাত দিতে সক্ষম হবেন।

তাই আপনার কাছে যদি সামান্য স্বর্ণ, কিছু নগদ টাকা এবং ব্যবসার পণ্য থাকে—সব মিলিয়ে যদি তা সাড়ে ৫২ তোলা রুপার সমমূল্যের হয়, তবেই আপনার ওপর যাকাত ফরজ হবে। আমরা সতর্কতা হিসেবে রুপার নিসাবকেই স্ট্যান্ডার্ড ধরব।

কোন কোন সম্পদের উপর যাকাত ফরজ?

অনেকে ভাবেন, শুধুমাত্র স্বর্ন ও রূপার থাকলেই যাকাত দিতে হবে, এগুলো না থাকলে যতটাকাই থাকুক যাকাত দিতে হবে না। যা আছে সব কিছুর ওপরই হয়তো যাকাত দিতে হবে। বিষয়টি এমন নয়। আপনার ব্যবহৃত গাড়ি, থাকার বাড়ি, ঘরের আসবাবপত্র, পরনের কাপড়—এগুলোর ওপর কোনো যাকাত নেই। যাকাত ফরজ হয় মূলত ‘বর্ধিষ্ণু’ বা উৎপাদনশীল সম্পদের ওপর। যেমন:

১. নগদ টাকা: হাতে থাকা ক্যাশ, ব্যাংক ব্যালেন্স (সেভিংস, কারেন্ট, ফিক্সড ডিপোজিট বা ডিপিএস-এ জমানো টাকা)।

২. স্বর্ণ-রৌপ্য: ব্যবহার করা হোক বা লকারে পড়ে থাক, গহনা বা বার—সব কিছুর ওজন হিসাব করতে হবে।

৩. ব্যবসায়িক পণ্য: আপনার যদি দোকান বা ব্যবসা থাকে, তবে বিক্রির জন্য রাখা সব পণ্যের বর্তমান বাজারমূল্য (Cost Price নয়, Market Price)।

৪. বিনিয়োগ: শেয়ার বাজার, বন্ড, সঞ্চয়পত্র বা অন্য কোনো ইনভেস্টমেন্টের বর্তমান ভ্যালু।

৫. গবাদি পশু: ব্যবসার উদ্দেশ্যে পালিত পশুপাখি।

আরও দেখুন: যাকাত ও ফিতরার মধ্যে পার্থক্য কি

যাকাত ফরজ হয়েছে কিনা – নিজেই যেভাবে হিসাব করবেন

আসুন, এবার আমরা খাতা-কলম নিয়ে বসে নিজের যাকাত নিজেই হিসাব করি। আপনি নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করতে পারেন:

ধাপ-১: মোট যাকাতযোগ্য সম্পদ যোগ করুন

  • হাতে বা ব্যাংকে নগদ টাকা = _ টাকা
  • স্বর্ণ ও রৌপ্যের বর্তমান বাজারমূল্য = _ টাকা
  • ব্যবসায়িক পণ্যের মূল্য = _ টাকা
  • অন্যান্য বিনিয়োগ (শেয়ার/বন্ড) = _ টাকা
  • অন্য কারো কাছে পাওনা টাকা (যা ফেরত পাওয়ার আশা আছে) = _ টাকা

মোট সম্পদ (A) = __ টাকা

ধাপ-২: ঋণ বা দায় বিয়োগ করুন

আপনার যদি কোনো তাৎক্ষণিক ঋণ থাকে যা পরিশোধ করতেই হবে, তা মোট সম্পদ থেকে বাদ যাবে। তবে দীর্ঘমেয়াদী কিস্তি (যেমন হাউজ লোন যা ১০ বছরে শোধ করবেন) পুরোটা বাদ যাবে না, শুধু আগামী ১ বছরের কিস্তি বা বর্তমান পাওনা বাদ দেওয়া যেতে পারে (এ বিষয়ে আলেমদের মতভেদ আছে, তবে সতর্কতা হলো শুধু মোট ঋণ বাদ দেওয়া)।

  • দোকানের বকেয়া/কর্মচারীর বেতন = _ টাকা
  • ব্যক্তিগত হাওলাত/ঋণ = _ টাকা

মোট ঋণ (B) = __ টাকা

ধাপ-৩: নিট সম্পদ বের করুন (A) – (B) = নিট সম্পদ।

ফলাফল: এই ‘নিট সম্পদ’ যদি আজকের বাজারে সাড়ে ৫২ তোলা রুপার দামের সমান বা তার বেশি হয়, তাহলে অভিনন্দন! আল্লাহ আপনাকে স্বচ্ছলতা দিয়েছেন এবং আপনার ওপর যাকাত ফরজ হয়েছে।

এখন এই নিট সম্পদের ২.৫% (বা ৪০ ভাগের ১ ভাগ) আপনাকে যাকাত হিসেবে গরীব-দুঃখীদের মাঝে বা যাকাতের নির্দিষ্ট ৮ টি খাতে বন্টন করে দিতে হবে।

উদাহরণ: ধরি, সব মিলিয়ে আপনার নিট সম্পদ ১০,০০,০০০ (দশ লাখ) টাকা। তাহলে আপনার যাকাত হবে: ১০,০০,০০০ × ২.৫% = ২৫,০০০ টাকা।

শেষ কথা

যাকাত কোনো বোঝা নয়, বরং এটি আপনার সম্পদের রক্ষাকবচ। রাসুল (সা.) বলেছেন, “তোমরা যাকাত দিয়ে তোমাদের সম্পদকে রক্ষা করো।” আসুন, আমরা পাই-পাই করে নিজেদের সম্পদের হিসাব করি এবং সঠিক সময়ে যাকাত আদায় করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করি।

যাকাত সম্পর্কিত আরও কোনো জটিল প্রশ্ন থাকলে বা শেয়ার বাজারের যাকাত নিয়ে বিস্তারিত জানতে আমাদের ব্লগের কমেন্ট সেকশনে জানাতে পারেন। আমরা পরবর্তী ব্লগে তা নিয়ে আলোচনা করব।

Similar Posts

মন্তব্য করুন